আগামীকাল রোববার (৭ নভেম্বর) বেলা ১১টায় বিআরটিএ সদর কার্যালয়ে ভাড়া সমন্বয় সংক্রান্ত সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর এ বিষয়ে সমাধান জানা যাবে। ফলে আজ শনিবার চলমান ভোগান্তি যে শেষ হচ্ছে না সে ব্যাপারে নিশ্চিত।
শুক্রবারের পরিবহন ধর্মঘটের প্রভাব পড়ে দেশজুড়ে। আন্তঃজেলা বাসস্ট্যান্ডগুলো থেকেও ছাড়ে দূরপাল্লার বাস। বন্ধ ছিল পণ্য পরিবহনও। এদিন সকাল ৬টায় শুরু হয় অনির্দিষ্টকালের গণ ও পণ্যপরিবহন ধর্মঘট। এতে দুর্ভোগে পড়ে পরীক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা রিকশা, রিকশা ও অ্যাপে রাইড শেয়ার করা মোটরসাইকেলের ভাড়া নেওয়া হয় দ্বিগুণ-তিনগুণ। এমনকি ৬০ টাকার ভাড়া ৬০০ টাকা গুনতে হয় যাত্রীকে। রাজধানীর পান্থপথ, সাইন্সল্যাব, শাহবাগ, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, পুরানা পল্টন, কাকরাইল, মগবাজার এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, ব্যক্তিগত গাড়ি, বিআরটিসি বাস চলাচল করছে। এ ছাড়া আর কোনো ধরনের গণপরিবহন চলেনি। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে অফিস-আদালত বন্ধ থাকায় রাজধানীতে মানুষের চলাচল কম থাকলেও এসব এলাকায় শিক্ষার্থী, যাত্রী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। বেশি ভাড়া দিয়েই তাদের যেতে হয়েছে নির্ধারিত গন্তব্যে। ব্যাংকের চাকরির পরীক্ষা দিতে সেগুনবাগিচার একটি স্কুলের সামনে অপেক্ষা করছিলেন সাভার থেকে আসা জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোর্সেদ আলম সাগর। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, ‘গাবতলী পর্যন্ত মোটরসাইকেলে আসি। গাড়ি না পেয়ে ওখান থেকে টেকনিক্যাল মোড় পর্যন্ত হেঁটে এসেছি। সেখান থেকে সিএনজি নিয়ে আজিমপুরে ফ্রেন্ডের বাসায় আসি। তার বাসা থেকে রিকশা নিয়ে সেগুনবাগিচায় এসেছি।’
ভাড়াবাবদ কত খরচ হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত ৩০০ টাকা খরচ হয়েছে। তার হিসাবে ফিরে যেতেও ৩০০ টাকা খরচ হবে। কিন্তু গণপরিবহন চললে ৬০ টাকাতেই হতো। সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাকর্মীর বাছাই পরীক্ষা দিতে মাগুরা থেকে এসেছিলেন মোহাম্মাদ সুজন মিয়া। তেজগাঁও এলাকায় কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘তেলের দাম বাড়ানোর বিষয়টা পুরো দেশে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। পরিবহনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। মাগুরায় ফিরে যেতে পারছি না। আজ রাত ঢাকায় থাকতে হবে। কিন্তু হোটেল ভাড়া দেওয়ার টাকা নেই। মাগুরা থেকে ঢাকার ভাড়া ৪০০ টাকা। কিন্তু ধর্মঘটের কারণে কাল ৬০০ টাকা নিয়েছে। পরীক্ষা দিতে আসাই লাগবে, বাধ্য হয়ে ওই ভাড়াই দিয়েছি।’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে, তেলের দাম প্রত্যাহার করতে হবে, না করলে বাসের ভাড়া ৫০ শতাংশ বাড়াতে হবে। অপরদিকে পণ্যপরিবহনে নিয়োজিত শ্রমিক-মালিকদের দাবি, তেলের দাম প্রত্যাহার করতে হবে। না হলে চলবে ধর্মঘট।
তেজগাঁ এলাকার ট্রাক ড্রাইভার মো. মোসলিম বলেন, ‘তেলের দাম রাতের আন্ধারে বাড়িয়ে দিছে, আমরাও আন্ধারি রাইতে ট্রাক বন্ধ করে দিছি। আমাদের দাবি তেলের দাম কমাইবো, আমরা গাড়ি ছাইড়া দিমু। তেলের দাম না কমাইলে, সবজির ট্রাকের ডাবল ভাড়া দিতে হইবো। আর তারা বিক্রি করবো ৫০ টাকার কাছে ১০০ টাকা। এতে আমাদেরই সমস্যা হইবো। আয় কম, কিন্তু ব্যয় ঠিকই হইবো। তাই দাম প্রত্যাহার করা হোক।’
রাস্তায় গণপরিবহন না থাকায় বাড়তি ভাড়া নিচ্ছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, রিকশা ও মোটরসাইকেল চালকরা। আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর সিএনজি পেয়েছেন রাফায়েতুল ইসলাম। মগবাজার মোড়ে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, গাড়ি না পেয়ে ৪০০ টাকা ভাড়া দিয়ে এসেছি। কিন্তু স্বাভাবিক সময়ে এই ভাড়া সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা হতো।
বরিশাল : বরিশাল নগরীর দুটি বাস টার্মিনাল ও বিভাগের অপর ৫ জেলা সদর থেকে অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লা রুটের গণপরিবহন বন্ধ রয়েছে। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন এসব রুটের যাত্রী এবং নিজ নিজ এলাকার ব্যবসায়ীরা। এদিকে সরকারিভাবে লঞ্চের ভাড়া না বাড়লেও অভ্যন্তরীণ রুটের নৌযানগুলোয় যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। নগরীর নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের একটি পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার আশরাফুল আলম চুন্নু বলেন, কেন্দ্রের নির্দেশে তারা বাস চলাচল বন্ধ রেখেছেন।
কুমিল্লা : কুমিল্লার সব বাস ও ট্রাক চলাচল বন্ধ রাখে কুমিল্লা জেলা পরিবহন মালিক সমিতি। কুমিল্লা জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি অধ্যক্ষ কবির আহমেদ জানান, সংগঠনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবহন চলাচল বন্ধের ঘোষণা না থাকলেও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে কোনো পরিবহনের মালিক সড়কে বাস নামাতে চাচ্ছে না।
চট্টগ্রাম : শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে চট্টগ্রামে গণপরিবহন চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে সড়কে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। তবে সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় গণপরিবহন বন্ধের প্রভাব তেমন পড়েনি। কিন্তু শহর ছেড়ে যেতে দুর্ভোগে পড়তে হয় যাত্রীদের। এ সুযোগে অটোরিকশা চালকরাও বাড়তি ভাড়া আদায় করছে। অন্যদিকে শুক্রবার ভোর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়ে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন বাস মালিক সমিতির সভাপতি বেলায়েত হোসেন বেলাল বলেন, সরকারের কাছ থেকে সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত আমরা গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখব। হয় তেলের দাম কমাতে হবে, নয় ভাড়া বাড়াতে হবে। লোকসান গুনে তো পরিবহন ব্যবসা চালাতে পারব না।
নাটোর : সকাল থেকে আন্তঃজেলা এবং দূরপাল্লার সব যানবাহন বন্ধ ছিল। অপরদিকে সরকারি পরিবহন বিআরটিসি ও রেল চলাচল করলেও দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষরা। ছোট ছোট ব্যাটারিচালিত যানবাহনে করে গন্তব্যে যাচ্ছে তারা। তবে দ্বিগুণ ভাড়া আদায়ের অভিযোগ যাত্রীদের।
নাটোর ট্রাক-লরি ও কাভার্ড ভ্যান মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মোস্তরুল ইসলাম আলম জানান, তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে শুক্রবার ভোর ৬টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাস চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির রাজশাহী বিভাগীয় সভাপতি ও রাজশাহী সড়ক পরিবহন গ্রুপের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাফকাত মঞ্জুর বিপ্লব জানান, হঠাৎ তেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বেড়েছে যা খুবই অস্বাভাবিক। এর প্রতিবাদে মালিক-শ্রমিক মিলে ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গাইবান্ধা : সকাল থেকে কোনো যাত্রীবাহী বাস গাইবান্ধা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যায়নি। বাস না পেয়ে অনেকে বাড়ি ফিরে যান আবার কেউ ট্রেন অথবা বিকল্প কোনো উপায়ে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করেন। জেলা বাস-মিনিবাস-কোচ ও মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আশরাফুল আলম বাদশা বলেন, ভাড়া না বাড়ানো পর্যন্ত ও সঠিক সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত আমরা সব গাড়ি বন্ধ রেখেছি।
সিলেট : শুক্রবার ভোর থেকে অনির্দিষ্টকালের পণ্যপরিবহন ধর্মঘট শুরু হয়। ফলে সিলেটে কোনো ট্রাক চলাচল করেনি।
রংপুর : নগরীর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে ঢাকার পথে কোনো দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যায়নি। অপরদিকে সাতমাথা ও মেডিকেল মোড় থেকে আন্তঃজেলাসহ কোনো রুটের বাস ছেড়ে যায়নি। এ কারণে শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হলেও এদিন সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে দেখা গেছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি ও রংপুর জেলা মোটর মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, সরকারের এ সিদ্ধান্ত পরিবহন শিল্পকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবে।
ঝালকাঠি : ঝালকাঠির আন্তঃজেলা সড়কের ৮টি রুটসহ গ্রামীণ জনপদের সড়কেও ডিজেলচালিত সব ধরনের যাত্রী ও পণ্যবাহী যান চলাচল বন্ধ ছিল। পরিবহন বন্ধ থাকায় সকাল থেকেই যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়ে।
বান্দরবান : ধর্মঘটের কারণে শুক্রবার সকাল থেকে বান্দরবান থেকে চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও ঢাকার উদ্দেশে দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ ছিল। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ রুটেও দূরপাল্লা বাস চলাচল করেনি। তবে মাহিন্দ্রা গাড়িগুলো ১০ থেকে ২০ টাকা ভাড়া বাড়িয়ে যাত্রী ওঠায়। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করে যাত্রীরা।
মেহেরপুর : সকাল থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল ও খুলনার উদ্দেশে ছেড়ে যায়নি কোনো পরিবহন। হঠাৎ দূরপাল্লার বাস বন্ধ হওয়ায় বিপাকে পড়ে সাধারণ মানুষ।
রাজশাহী ব্যুরো : শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার সব বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সড়কপথে রাজশাহীর সঙ্গে ঢাকাসহ সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে যাত্রীদের মধ্য অসহনীয় দুর্ভোগ নেমে এসেছে।
রাজশাহী বিভাগীয় পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি সাফকাত মঞ্জুর বিপ্লব বলেন, সরকারের সঙ্গে কোনোরকম আলোচনা ছাড়া আপাতত বাস চলাচলের কোনো সিদ্ধান্ত তাদের নেই।
প্রসঙ্গত, জ্বালানি তেল ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট ডাকেন গণ ও পণ্যপরিবহন মালিক-শ্রমিকরা।