বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশ শুরু হবে বেলা ১১টায়। তবে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পুরো মাঠ বিএনপি নেতাকর্মীতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। জনসমাগম ছড়িয়ে কমলাপুর রেলওয়ে, যাত্রাবাড়ীসহ আশপাশের এলাকায়।
এখনো মিছিল নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসছেন দলটির নেতাকর্মীরা। অনাকাঙ্খিত ঘটনা এড়াতে তৎপর রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও।
নোয়াখালীর মাইজদি সদর থেকে সমাবেশে যোগ দিতে এসেছেন বিএনপি সমর্থক বাহার উদ্দিন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচনের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে তিনি এসেছেন এই সমাবেশে। তিনি বলেন, ‘যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় ভেঙে ভেঙে আসতে হয়েছে। দুইদিন আগেই সমাবেশে চলে এসেছি আমি।’
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ থেকে এসেছেন রেজাউল হক। তিনি বলেন, ‘আমি সাধারণ মানুষ। কোনো দল সমর্থন করি না। দব্রমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ দেশের অস্বস্তিকর অবস্থার যেন পরিবর্তন হয়, সেই প্রত্যাশায় আমি সামাবেশে যোগ দিয়েছি।’
সকালে গিয়ে দেখা যায়, গোলাপবাগ মাঠ ভরে গেছে বিএনপির নেতাকর্মী দিয়ে। মাঠের পশ্চিম পাশে সমাবেশের মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। মাঠে প্রবেশে রয়েছে চারটি গেট।
সমাবেশস্থল নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যে সমাবেশের আগের দিন শুক্রবার (৯ ডিসেম্বর) রাজধানীর গোলাপবাগ মাঠের অনুমতি পায় বিএনপি। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর অনুমতির পর প্রয়োজনে ক্ষতিপূরণ দেওয়া সাপেক্ষে মাঠ ব্যবহারের বরাদ্দ বিএনপিকে নিতে হয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে।
শুক্রবার অনুমতি পাওয়ার পরপরই ঢাকা দুই মহানগর ও বিভিন্ন জেলা থেকে আসা নেতাকর্মীরা ভিড় করতে শুরু করেন মাঠে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা নাগাদ খেলার মাঠটির প্রায় অর্ধেক ভরে যায়। এর ঘণ্টাখানেক পর সমাবেশের মাঠে শুরু হয় মঞ্চ নির্মাণের কাজ।
ঢাকা বিভাগীয় এই সমাবেশের মধ্যদিয়েই শেষ হবে ১২ অক্টোবর চট্টগ্রাম বিভাগ দিয়ে শুরু হওয়া বিএনপির ১০ সাংগঠনিক বিভাগের গণসমাবেশের কর্মসূচি।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় এই কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জ্বালানি তেলসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মূল্য বৃদ্ধি ও চলমান আন্দোলনে নেতাকর্মীদের হত্যার প্রতিবাদে, দলীয়প্রধান খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নাকশকতার মামলায় গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাই তিনি সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকতে পারছেন না।
তার অনুপস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সমাবেশে প্রধান অতিথি থাকবেন। কুমিল্লা ছাড়া বাকি আটটি সমাবেশেই প্রধান অতিথি ছিলেন মির্জা ফখরুল।
গ্রেপ্তার হওয়ার কারণে সমাবেশে থাকতে পারেননি স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশ প্রস্তুতি কমিটির প্রধান উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস, দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও প্রস্তুতি কমিটির সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালামসহ আরও অনেকে।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করবেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমান। সঞ্চালনা করবেন ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের সদস্য সচিব যথাক্রমে আমিনুল হক ও রফিকুল আলম।
গত ১২ অক্টোবর থেকে গণপরিবহনে ধর্মঘট, গ্রেপ্তার, হুমকি-ধমকির মধ্যেই ইতোমধ্যে সারা দেশে ৯টি বিভাগীয় গণসমাবেশ শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন করেছে বিএনপি।
গত ১২ অক্টোবর চট্টগ্রাম, ১৫ অক্টোবর ময়মনসিংহে, ২২ অক্টোবর খুলনা, ২৯ অক্টোবর রংপুর, ৫ নভেম্বর বরিশাল, ১২ নভেম্বর ফরিদপুর, ১৯ নভেম্বর সিলেট, ২৬ নভেম্বর কুমিল্লা, ৩ ডিসেম্বর রাজশাহী গণসমাবেশ হয়।
তবে বিশেষ করে ১০ ডিসেম্বর ঢাকা অচল, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কথায় দেশ চলা এবং সমাবেশে যোগদানের বক্তব্যে নড়েচড়ে বসে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাসীন দল ও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মাসব্যাপী বাগ্যুদ্ধ, ‘খেলা হবে’ বলে হুমকি-পাল্টা হুমকিতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজনৈতিক অঙ্গন।
এতে জনমনে দেখা দেয় ব্যাপক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। শঙ্কা কিছুটা সত্যিও হয়েছে। সমাবেশের দু’দিন আগেই নয়াপল্টনে বিএনপি নেতাকর্মীর সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে একজন নিহত ও শতাধিক আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে।
সরকার বিএনপির এই সমাবেশকে কেন্দ্র করে রাজধানীজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা বলয়। সমাবেশকেন্দ্রিক নিরাপত্তায় মোতায়েন করা হয়েছে ডিএমপির ২৫ হাজারের বেশি সদস্য।
এ ছাড়া মাঠে আছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার বিপুলসংখ্যক সদস্য। রাজধানীর প্রবেশমুখগুলোতে ব্যাপক তল্লাশি চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট।
গত কয়েকদিনের তুলনায় সমাবেশের এক দিন আগে শুক্রবার তল্লাশি তৎপরতা ছিল অনেক বেশি। রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল এবং লঞ্চঘাটে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় ছিল র্যাব-পুলিশসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। অনেকটা ফাঁকা অবস্থায় আছে রাজধানীর অলিগলিসহ আবাসিক হোটেলগুলো। অন্যদিকে গত ১ ডিসেম্বর থেকে পুলিশ যে অভিযান শুরু করেছে সেটিও অব্যাহত আছে। এ অভিযান চলবে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত। তল্লাশি কার্যক্রমের অংশ হিসাবে যাত্রীদের হোয়াটসঅ্যাপ এবং মেসেঞ্জার গ্রুপ চেক করছে পুলিশ। পুলিশের অতিরিক্ত তৎপরতার কারণে যাত্রীদের মধ্যে বিরাজ করছে চাপা আতঙ্ক। এ কারণে বাসগুলোতে যাত্রী কম।