আগামীকাল সোমবার (১০ অক্টোবর) উদ্বোধন হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার মধুমতি নদীর উপর নির্মিত ৬ লেনের মধুমতি সেতু। ভার্চুয়াল মাধ্যমে এ সেতুর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইতিমধ্যে এ সেতুর সকল কাজ শেষ হয়েছে। এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত হওয়ায় বেনাপোল স্থল বন্দর দিয়ে ভারত থেকে সহজেই পন্য আমদানী ও রফতানি করা যাবে। যান চলাচলের জন্য এ সেতু খুলে দেয়ায় দীর্ঘ দিনের ভোগান্তির থেকে রক্ষাসহ আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটবে।
শনিবার (০৮ অক্টোবর) সরেজমিনে গিয়ে জানাগেছে, গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার মধুমতি নদীর উপর দিয়ে যাতায়াতকারীদের ভোগান্তি ছিল দীর্ঘ দিনের। ভোগান্তি কমাতে মধুমতি নদীর কালনা পয়েন্টে ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি ৬ লেনের মধুমতি সেতুর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সেতুটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৯৬০ কোটি টাকা। এরপরই ২০১৮ সালে শুরু হয় কর্মযজ্ঞ। সেতু নির্মাণ শুরু পর দীর্ঘ ৫ বছর পর উদ্বোধন হতে যাচ্ছে সেতুটি। আগামীকাল ১০ অক্টোবর ভার্চুয়াল মাধ্যমে গণভবন থেকে এ সেতুর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাই সেতুর পশ্চিম পাড়ে ও গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কায্যালয়ে নেতা নয়েছে নানা প্রস্তুতি।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতরের ক্রস বর্ডার রোড নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে মধুমতি সেতু নির্মিত হয়েছে। সেতুর পশ্চিমপ্রান্তে নড়াইলের কালনাঘাট এবং পূর্বপ্রান্তে গোপালগঞ্জের শংকরপাশা। কালনাঘাট থেকে ঢাকার দুরত্ব মাত্র ১০৮ কিলোমিটার। ফলে ঢাকার সঙ্গে নড়াইল, বেনাপোল, খুলনাসহ যশোর অঞ্চলের আশেপাশের সড়ক যোগাযোগ কোথাও ১০০ কিলোমিটার, কোথাও আবার ২০০ কিলোমিটার কমে যাবে।
মধুমতি সেতু দেশের প্রথম ছয় লেনের সেতু। দৃষ্টিনন্দন এ সেতু বাংলাদেশের প্রথম ৬ লেনের এবং সবচেয়ে বড় নেলসন লোস আর্চ টাইপের (ধনুকের মতো বাঁকা) সেতু। সেতুর উভয় পাশে ৪ দশমিক ২৭৩ কি:মি: লম্বা ও ৩০ দশমিক ৫০ মিটার চওড়া সংযোগ সড়ক এর কাজ শেষ হয়েছে। ছয় লেনের এ সড়কের মাঝখানের ৪ লেন দিয়ে দ্রুত গতির গাড়ি পাশের দুই লেন দিয়ে কম গতির গাড়ি চলবে। এশিয়ান হাইওয়ের ওপর অবস্থিত এটি। সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে সিলেটের তামাবিল হয়ে ঢাকা, ভাঙ্গা, নড়াইল, যশোর, বেনাপোল, কোলকাতা পর্যন্ত সরাসরি ভূমিকা রাখবে। এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত হওয়ায় বেনাপোল স্থল বন্দর দিয়ে ভারত থেকে সহজেই পন্য আমদানী ও রফতানি করা যাবে। এতে বাড়বে আর্ন্তজাতিক বাণিজ্যের প্রসার। এছাড়া স্থানীয়ভাবে উতপাদি কৃষিপন্য সহজেই বাজারজাত করায় সুফল পাবে এ অঞ্চলের কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। এ সেতুকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠলে ব্যবসা বানিজ্যের প্রসার ঘটার পাশাপশি জীবনমান সহজ হবে।
সেতুটি চলাচলের জন্য খুলে দেয়ায় দীর্ঘ ভোগান্তির অবসান হতে যাচ্ছে চলাচলকারীদের। ফলে সহজেই দ্রুত সময়ে নড়াইলসহ যশোর অঞ্চলের মানুষ ভোগান্তি ছাড়াই রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে যাতায়েত করতে পারবে। ফলে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের অন্তত: ১৩টি জেলার মানুষের দীর্ঘ দিনের দুর্ভোগ লাঘব হবে। রাতের দৃষ্টিনন্দন আলোয় মধুমতি সেতুর নান্দনিক স্থাপত্যশৈলী আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। বর্তমানে সেতুতে প্রবেশের অনুমতি না থাকলেও দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই ছুটে আসছেন এখানে।
এদিকে, যশোরের মনিহার সিনেমা হল চত্বর থেকে নড়াইলের কালনাঘাট পর্যন্ত ৫২ কিলোমিটার সড়ক অপ্রশস্ত থাকায় মধুমতি সেতু চালু হয়ে এ সড়কে যানবাহনের চাপ সামাল দেয়া অনেক কঠিন হয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন চালক ও যাত্রীসাধারণ। যদিও ১৮ ফুট প্রশস্ত সড়কটি ২৪ ফুট করার উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদফতর। এ লক্ষ্যে সড়কের দুই পাশে গাছকাটা শেষ পর্যায়ে থাকলেও প্রশস্তকরণের কাজ এখনো শুরু হয়নি।
শিক্ষার্থী সোহাগ খান বলেন, এটি দেশের প্রধম ৬ লেনের সেতু। দেশের আগে কোথাও এমন সেতু হয়নি। এ সেতুটি হবার পর আমরা এখন পদ্মা সেতুর সুবিধা সরাসরি ভোগ করেত পারবো। ঢাকা যেতে আমদের আর ভোগান্তিতে পরতে হবে না।
শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলাম বলেন, এই সেতুটি উদ্বোধন হবার পরপরই দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের মাধ্যে সেতু বন্ধন হতে যাচ্ছে। সেতুটি উদ্বোধন হবার হলে এ অঞ্চলের মানুষ উপকৃত হবে।
দর্শনার্থী সোহেল রানা বলেন, মধুমতি সেতুটি উদ্বোধন হতে যাচ্ছে এতে আমরা খুব আনন্দিত। তাই উদ্বোধনের আগে মধুমতি সেতুটি দেখতে এসেছি, দেখা খুব ভাল লাগলো।
যাত্রী ঝর্ণা বিশ্বাস বলেন, যশোর যেতে কালনা পয়েন্ট মধুমতি নদী পার হতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হতো। সেতুটি উদ্বোধন হলে আর আমাদের ভোগান্তিতে পরতে হবে না। সহজেই যশোর ও বেনাপোল বন্দরে যাতায়েত করতে পারবো।
ফরিদপুর জেলার নিখিল বসু বলেন, এ সেতু উদ্বোধন হওয়ায় এ অঞ্চলের কৃষক ও ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন। কৃষকরা তাদের কৃষিপন্য সহজেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠাতে পারবেন। সেই সাথে ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা বাণিজ্যের সম্প্রসার ঘটনাতে পারবে।
নিরাপদ সড়ক ও রেলপথ বাস্তবায়ন পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সৈয়দ খায়রুল আলম বলেন, এ সেতুটি ঘিরে নড়াইলের লোহাগড়া এলাকায় অর্থনৈতিক জোন করা সম্ভব। যত দ্রুত অর্থনৈতিক জোন করা যাবে তত দ্রুত এ সেতুর প্রকৃতি সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে পারবে এ অঞ্চলের মানুষ।
এদিকে, সেতু কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, এ সেতুর টোলের হার চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। কন্টেইনার বা ভারী মালামাল পরিবহনে সক্ষম যানের টোল ধরা হয়েছে ৫৬৫ টাকা, বড় ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যান ৪৫০ টাকা, মধ্যম ট্রাক ২২৫ টাকা, বড় বাস ২০৫ টাকা, ছোট ট্রাক ১৭০ টাকা, পাওয়ার টিলার বা ট্রাক্টর ১৩৫ টাকা, মিনিবাস বা কোস্টার ১১৫ টাকা, মাইক্রোবাস বা পিকআপ ৯০ টাকা, সিডান কার ৫৫ টাকা, টেম্পো বা সিএনজিচালিত অটোরিকশা ২৫ টাকা, মোটরসাইকেল ১০ টাকা এবং ভ্যান, রিকশা বা বাইসাইকেল ৫ টাকা।
মধুমতি সেতুর প্রকল্প ব্যবস্থাপক ও সওজ নড়াইলের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: আশরাফুজ্জামান বলেন, সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের ক্রস বর্ডার রোড নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে এ সেতু নির্মিত হয়েছে। জাপানের টেককেন করপোরেশন ও ওয়াইবিসি এবং বাংলাদেশের আবদুল মোনেম লিমিটেড যৌথভাবে এ সেতুর ঠিকাদার।
এ সেতু চালু হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্তত ১০ জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব হবে। ভোমরা ও বেনাপোল স্থল বন্দর এবং পায়রা সমুদ্র বন্দরের পূর্ণাঙ্গ সুবিধা পাওয়াসহ এশিয়ান হাইওয়ের বিচ্ছন্নতা দূর করায় এ অঞ্চলের অর্থ সামাজিক উন্নয়ন ঘটবে বলেও মনে করেন তিনি।