ফেনীর সীমান্তবর্তী উপজেলা পরশুরাম, ফুলগাজীও ছাগলনাইয়াতে ২ মাসের ব্যবধানে তৃতীয় দফায় বন্যা হয়েছে। গত কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিপাত ও ভারতের উজানের পানিতে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনীয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ১৭টি ভাঙন অংশ দিয়ে পানি প্রবেশ করায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো মানুষ। পানিতে তলিয়ে যাওয়ার উপজেলার অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সড়কে বন্ধ হয়ে পড়েছে যান চলাচল।
মঙ্গলবার (২০ আগস্ট) সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১৮৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ফেনী আবহাওয়া অধিদপ্তরের উচ্চ পর্যবেক্ষক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২ আগস্ট মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনীয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ১৭টি অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছিল। গত কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিপাত ও ভারতের উজানের পানিতে সোমবার (১৯ আগস্ট) দুপুর থেকে আবারও ভাঙন স্থান দিয়ে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করতে শুরু করে। এতে পরশুরাম উপজেলার পশ্চিম অলকার মাস্টারবাড়ি সংলগ্ন মুহুরী নদীর বাঁধের ভাঙন অংশ, মির্জানগর ইউনিয়নের দক্ষিণ কাউতলি কাশিনগর ও চম্পকনগর এলাকায় বাঁধের দুইটি অংশ, চিথলিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ শালধর জহির চেয়ারম্যানের বাড়ি সংলগ্ন, দক্ষিণ শালধর, কহুয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের টেটেশ্বর ও সাতকুচিয়া এলাকার ভাঙন অংশ এবং পশ্চিম মির্জানগর এলাকার সিলোনিয়া নদীর বাঁধের ভাঙন অংশ দিয়ে পানি প্রবেশ করছে। রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। লোকালয়ে পানি ঢুকে ৩ উপজেলার অন্তত ৮২টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে প্রায় ১৮ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
পানি বন্দি হয়ে পড়া বাসিন্দ মো. শাহীন বলেন, অল্প কয়েকদিনের ব্যবধানে ঘরবাড়ি তিনবার পানিতে তলিয়ে গেছে। এভাবে টানা বৃষ্টি হলে আমাদের অবস্থা কি হবে আল্লাহ ভালো জানেন। প্রবল স্রোতে পানি প্রবেশ করছে। খুব কষ্টে দিন পার করছি।
বীরচন্দ্র নগর এলাকার বাসিন্দা বাহার উদ্দিন বলেন, এদিকের এলাকা উঁচু হওয়ায় সাধারণত বন্যার পানি প্রবেশ করে না। কিন্তু এবার ভারী বর্ষণে ঘর পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে গেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও আত্মগোপনে। কোনো ধরনের সহায়তা দূরের কথা, কেউ খোঁজখবরও নেননি আমাদের।
ফুলগাজী উপজেলার নিলক্ষী এলাকার কৃষক আলী আজম বলেন, জুলাইয়ের বন্যায় ধানের বীজতলা পানিতে তলিয়ে যায়। নতুন করে বীজতলা তৈরি করে রোপণের কয়েকদিন পরে ২ আগস্ট আবারও পানিতে ডুবে যায়। গত দুইদিনের ভারী বৃষ্টিতে এখন নতুন করে সব জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। দেড় মাসের মধ্যে তিনবার বন্যায় হওয়া ক্ষতি কাটিয়ে উঠার সুযোগ নেই। আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফেলতির কারণে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে বারবার লোকালয় প্লাবিত হচ্ছে। ভেঙে যাওয়া বাঁধ সংস্কারে গড়িমসি করার কারণে আবারও একই স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এখন ভাঙন স্থান দিয়ে পানি ঢুকে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যে, মুহুরী নদীতে পানি বিপৎসীমার ৫৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসনের প্রস্তুতি রয়েছে। সিলোনিয়া নদীর বাধে নতুন করে কোন ফাটল না দেখা দিলেও পূর্বের ফাটল দিয়ে এবং বাধ উপচে পানি ঢুকে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করেছে। বর্তমানে ফেনী বিলোনিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের ফুলগাজী এবং পরশুরাম অংশ প্লাবিত হওয়ায় কার্যত জেলা হেডকোয়ার্টারের সাথে সড়কপথে উপজেলার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
জেলা প্রশাসক মুছাম্মৎ শাহীনা আক্তার জানান, বন্যা পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন কাজ করছে।