মার্চ মাস আমাদের কাছে এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মাস। এই মাসে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ অঙ্কুরিত হয়। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান আকস্মিকভাবে এক বেতার ভাষণ দেন। আর সেই ভাষণে অনির্দিষ্টকালের জন্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ দ্য ডন পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ভাষণে তিনি উল্লেখ করেন, পাকিস্তানে এখন ভয়াবহ রাজনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। তাই আমি জাতীয় পরিষদের আসন্ন অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করলাম। ঘোষণা শোনামাত্র তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে আসে।
শুধু তাই নয়, এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগ সভাপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হোটেল পূর্বাণীতে সংসদীয় দলের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ৭ কোটি বাঙালির কল্যাণে আমি সব কিছুই উৎসর্গ করব। গত ২৩ বছর ধরে যে আচরণ চলছে তার অবসান হওয়া দরকার। আর এর জন্য প্রয়োজন একটি সম্মিলিত সংগ্রাম। একটি সংখ্যালঘু দলের বিরোধিতার কারণে গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হয়েছে। আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে এটা বিনা প্রতিবাদে ছেড়ে দিতে পারি না। এ সময় তিনি ২ মার্চ সাধারণ ধর্মঘট পালন করার নির্দেশ দেন। এ ছাড়া ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জনসভায় ঘোষণা দেন।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী সেদিনই তিনি ছাত্রনেতাদের ডাকেন। একই সঙ্গে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন। তিনি ৬ মার্চ পর্যন্ত সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত প্রতিদিন অর্ধদিবস হরতাল পালনের নির্দেশ দেন। এ ছাড়া ৩ মার্চ জাতীয় শোক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনে ছাত্রনেতা আবদুল কুদ্দুস মাখন, আ স ম আবদুর রব, নূরে আলম সিদ্দিকী ও শাজাহান সিরাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়েছিল আওয়ামী লীগ। আর আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আকস্মিক স্থগিত করাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা হয়। যে কারণে অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বিক্ষোভে ফুঁসে ওঠে। সেদিন দুপুর থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শুরু হয় পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অসহযোগ। রাস্তায় নেমে বাঙালিরা স্লোগান দেয়, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’। ঢাকাসহ ঢাকার বাইরেও কোনো কোনো শহরে বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। ফার্মগেটের কাছে একটি মিছিলের ওপর চলে গুলি। শেষ পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়।
সারা শহরে থমথমে ভাব নেমে আসে। সন্ধ্যায় গভর্নর অ্যাডমিরাল আহসানের পরিবর্তে প্রাদেশিক সামরিক প্রশাসক লে. জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খানকে বেসামরিক গভর্নরের দায়িত্ব দেওয়া হয়।