দেশের উন্নয়নের ইতিহাসে এক মাইলফলক রচিত হতে যাচ্ছে পায়রা বন্দর। প্রায় ১১ হাজার ৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে পায়রা বন্দরের ক্যাপিটাল ড্রেজিং কাজ ও আটটি জাহাজের উদ্বোধন এবং বন্দরের প্রথম টার্মিনাল, ৬-লেন সংযোগ সড়ক এবং সেতু নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হতে চলেছে। বৃহস্পতিবার (২৭ অক্টোবর) গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি সংযুক্ত হয়ে এসব উন্নয়ন কাজের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, বন্দরের রাবনাবাদ চ্যানেলের ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের ফলে বন্দর থেকে সাগরের মধ্যে ৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ, ১০০-১২৫ মিটার প্রশস্ত এবং ১০.৫ মিটার গভীরতার একটি চ্যানেল সৃষ্টি হবে। এর ফলে বন্দরে ৪০ হাজার টন কার্গো বা ৩,০০০ কনটেইনারবাহী জাহাজ ভেড়ানোর সক্ষমতা তৈরি হবে। ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের জন্য ব্যয় হবে ৪ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা। বিশ্বখ্যাত বেলজিয়ামভিত্তিক ড্রেজিং কোম্পানি জান ডি নুল (Jan de nul) ড্রেজিং কাজটি করবে।
পায়রা বন্দরের জন্য নির্মিত আটটি জাহাজ দিয়ে বন্দরে দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজের আগমন-বহির্গমন ও চ্যানেলের সংরক্ষণ কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করতে পারবে। আটটি জাহাজ নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ২০৯ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। আটটি জাহাজের মধ্যে দুটি পাইলট ভেসেল, দুটি হেভি ডিউটি স্পিডবোট, একটি বয়া লেইং ভেসেল, একটি সার্ভে বোট এবং দুটি টাগবোট। দুটি পাইলট ভেসেল নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৫১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা; দুটি হেভি ডিউটি স্পিডবোট নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৬৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এ চারটি জাহাজ নির্মাণ করেছে খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড।
অন্যদিকে, আনন্দ শিপইয়ার্ড অ্যান্ড স্লিপওয়েজ লিমিটেড নির্মিত বয়া লেইং ভেসেল নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা; ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড নির্মিত সার্ভে বোট নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ২১ কোটি ৫০ লাখ টাকা; নিউ ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপ বিল্ডার্স লিমিটেড নির্মিত দুটি টাগবোট নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। পায়রা বন্দরের প্রথম টার্মিনাল, ৬-লেন সংযোগ সড়ক এবং সেতু নির্মাণ সম্পন্ন হলে টার্মিনালটির তিনটি জেটিতে একত্রে তিনটি বিদেশি কন্টেইনার বা বাল্ক কার্গোবাহী জাহাজ ভিড়তে সক্ষম হবে।
বন্দরের প্রথম টার্মিনাল নির্মাণে ব্যয় হবে ৪৫১৬.৭৫ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে অপারেশনাল কাজ শুরু করা হবে। প্রথম টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয়ের মধ্যে জেটি নির্মাণ কাজের চুক্তিমূল্য ৯১৬.৯৪ কোটি টাকা এবং ইয়ার্ড নির্মাণ কাজের চুক্তিমূল্য ১ হাজার ৩৪.৪১ কোটি টাকা। নির্মিতব্য জেটিতে ৪০ হাজার টন ধারণক্ষমতার জাহাজ বার্থিং ও খালাসের সুবিধা রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে জেটিটিতে ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যের তিনটি জাহাজ একসঙ্গে বার্থিং করতে পারবে। ইয়ার্ডে হাই কনটেইনার স্থাপনের সংস্থান রাখার পাশাপাশি রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন (আরটিজি) ব্যবহার করে কনটেইনার স্টেকিং ও লোড-আনলোড কাজ সম্পাদন করা হবে। ইয়ার্ড ব্যবহার করে বছরে বিশ ফুট দৈর্ঘ্যের ৮ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে বলেও বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে।
পাশাপাশি ৬.৩৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ৬ লেনের সংযোগ সড়কটি ডিপিপির সংস্থান অনুযায়ী ডিপোজিটরি ওয়ার্কের আওতায় সড়ক ও জনপথ বিভাগ নির্মাণ করছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ স্থানীয় দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডকে নিয়োগ করা হয়েছে এবং কাজের চুক্তিমূল্য ৬৫৫.৫০ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে কাজটি শেষ হবে। পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের মালামাল পরিবহনের জন্য আন্ধারমানিক নদীর ওপর ১ হাজার ১৮০ মিটার দীর্ঘ ব্রিজ নির্মাণ করা হবে। এ কাজের প্রাক্কলিত ব্যয় ৭৪০ কোটি টাকা। এর নির্মাণকাজ শেষ করতে আনুমানিক ৩০ মাস সময় লাগবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের জানিয়েছে, এসব উন্নয়ন কাজের ফলে বন্দরটি পরিপূর্ণ সক্ষমতার সঙ্গে কাজ করতে পারবে এবং দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে নতুন মাত্রা যোগ করবে, যার সুফল বাঙালি জাতি যুগ যুগ ধরে ভোগ করবে। এরই মধ্যে বন্দরটিতে ২৩৬টি সমুদ্রগামী জাহাজ আগমন করেছে, যার মাধ্যমে প্রায় ৫৪৮ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালের ১৯ নভেম্বর পায়রা সমুদ্রবন্দর উদ্বোধন করেন।