গণসমাবেশকে বাধাগ্রস্ত করতে ধর্মঘটের নামে ২৮ অক্টোবর থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয় রংপুরগামী বাস, বিআরটিসি বাস, ট্রাক, কার ও মাইক্রোবাসের যোগাযোগ। এতে করে যাত্রীদের পড়তে হয় চরম বিপাকে। শেষ পর্যন্ত রংপুরকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার পরও চতুর্থ বিভাগীয় গণসমাবেশে লাখের অধিক মানুষের সমাগম হয়েছে বলে দাবি করছে বিএনপি।
সব বাধা পেরিয়ে বিএনপির সমাবেশ জনস্রোতের ঢল নামে। বাস্তবে শুধু ধর্মঘটই নয়, পথে পথে নানা বিপত্তি ও পুলিশের তল্লাশিসহ বাধা বিপত্তির মুখে পড়তে হয় বিএনপির নেতাকর্মীদের। মেট্রোপলিটন এলাকায় কম হলেও জেলা পর্যায়ে ধরপাকড় ও পুলিশি হয়রানি বেশি করা হয়েছে বলে অভিযোগ বিএনপির নেতাদের। এছাড়াও আবাসিক হোটেল ও মেসগুলোতে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে রাতে তল্লাশি চালানো হয়েছে।
শনিবার (২৯ অক্টোবর) কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে চতুর্থ গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। তার আগেই বৃহস্পতিবার (২৭ অক্টোবর) থেকে সমাবেশস্থলে আসতে শুরু করে নেতাকর্মীসহ সমর্থকরা। ধর্মঘট চললেও বিভাগের আট জেলা বিশেষ করে ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলার বিভিন্ন উপজেলার গ্রামগুলোতে থেকে ট্রাক বাস ভাড়া করে, ট্রেনযোগে, চার্জার অটো ও সিএনজিতে করে এবং শেষ পর্যায়ে পায়ে হেঁটে শুক্রবার এসে পৌঁছেন হাজার হাজার নেতাকর্মী।
তারা রাতে নগরীর বিভিন্ন অস্থায়ী ক্যাম্পে অবস্থান নেন। সেখানে আসা নেতাকর্মীদের জন্য নগরীর ২০টি স্কুল মাঠে অস্থায়ী প্যান্ডেল তৈরি করা হয়। এসব প্যান্ডেলে অবস্থান করেন দলটির কয়েক হাজার নেতাকর্মী। সেখানে স্বেচ্ছাসেবকরা দেখভাল করেন। তাদের থাকার জন্য ধানের খড় বিছিয়ে দেওয়া হয় এবং ওপরে সামিয়ানার কাপড় দেওয়া হয়।
শুক্রবার (২৮ অক্টোবর) বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে যায় ঈদগাহ মাঠ। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত যতই বাড়তে থাকে আর লোকসমাগম ততই বেশি হতে থাকে। রাতেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে হয়ে যায় মাঠ।
পরে শনিবার (২৯ অক্টোবর) সকাল থেকে সমাবেশের মঞ্চ থেকে বিভিন্ন গান প্রচার করে ও মুহুর্মুহু স্লোগান দিয়ে কর্মী সমর্থকদের উজ্জীবিত করে রাখা হয়।
শুক্রবার রাতে সরেজমিনে দেখা যায়, রাত যত বাড়ে নেতা-কর্মীর ভিড় ততই বাড়ে। মাঠের মধ্যে নেতা-কর্মীরা ‘অ্যাকশন অ্যাকশন, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’, ‘খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই’, ‘ভয় করি না বুলেট-বোমা, আমরা সবাই জিয়ার সেনা’ এমন নানান ধরনের স্লোগান দিচ্ছিলেন। পুরো সমাবেশস্থলে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে বিএনপি নেতা-কর্মীরা স্লোগান দিয়ে মাঠ প্রদক্ষিণ করে মাতিয়ে রাখেন।
বাবু নামে দিনাজপুরের বিরল উপজেলা থেকে আসা এক কর্মী বলেন, আমরা দুপুরের ট্রেনে এসেছি। রংপুর স্টেশনে নামার পর আওয়ামী লীগের কিছু লোকজন ভয় দেখাচ্ছিল। বলছিল, খেলা হবে আসো, এছাড়াও নানান ধরনের কথাবার্তা বলছিল।
তিনি বলেন, হোটেলে জায়গা নাই, আত্মীয় স্বজনও নাই। তাই আমরা এক সঙ্গে দশ-বারো জন করে মাঠে শুয়ে আছি।
তিনি আরও বলেন, তারা চিড়া মুড়ি আর গুড় নিয়ে এসেছেন, গভীর রাতে ও সকালে সেগুলো খাবেন। মাঠে অনেক লোক থাকায় কোনো সমস্যা নাই। রাতেই বিভাগের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে নেতা-কর্মীরা এসে সমাবেশস্থলে অবস্থান নিয়েছেন। সেখানেই হয়েছে রান্না-খাওয়া।
এভাবেই উৎসবমুখর পরিবেশে রাত পার করেছেন নেতাকর্মীরা। মাঠের অপর এক পাশে দেখা গেছে, অবস্থান নেওয়া নেতাকর্মীরা সময় কাটাচ্ছে গল্প-আড্ডা, গান আর স্লোগানে। কেউ কেউ ফেসবুকে লাইভ ও সেলফি তুলে নিজেদের অবস্থান পরিবার পরিজনসহ সহকর্মীদের পরিস্থিতি জানান দিচ্ছেন। তাঁবু টাঙ্গিয়ে কেউ কেউ শুয়ে ছিলেন। সবমিলিয়ে রাত থেকেই উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছিল সমাবেশস্থল।
এসময় গাইবান্ধা সুন্দরগঞ্জ থেকে আসা বিএনপি কর্মী আসলাম মিয়া জানান, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর গল্প করে রাত পার করছি। এখানে এসে অনেকেই গান করেছেন। আবার কেউ কেউ শুয়ে ছিলেন। কীভাবে যে রাত চলে যাচ্ছে বুঝতেই পারছি না।
পঞ্চগড়ের বোদা থেকে আসা কয়েকজন জানান, তারা অনেকেই এসেছে। হোটেলে তো এতো মানুষের সিট মিলবে না। তাই সমাবেশস্থলেই শুয়ে বসে রাত পার করছি এসময় পাশে কয়েকজন বয়োবৃদ্ধও শুয়ে ছিলেন।
গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার ৯ নম্বর কচুয়া ইউপির ওয়ার্ড সভাপতি আতিক জানান, আমরা প্রায় ১২শ জন নেতাকর্মী গতকাল ট্রেনে করে রংপুরে আসি। পরে জুম্মাপাড়ার এক স্কুলে আমাদের থাকতে দেয়। সেখানে রাতে ও সকালে খিচুড়ি খেয়েছি।
তিনি বলেন, আমরা সমাবেশ সফল করার জন্য এসেছি, গরীব-ধনী মানুষকে বাঁচানোর জন্য এসেছি, হাসিনার পদত্যাগের জন্য এসেছি।
বিএনপিকর্মী আব্দুল জানান, মাঠেই রান্না করা খাবার খেয়েছি। কোনো সমস্যা হয়নি। অনেক মজা পেয়েছি ও ভালোই লেগেছে।
অন্যদিকে, শনিবার ভোর থেকে রংপুর মহানগরীর প্রবেশমুখ মাহিগঞ্জ সাতমাথা, মেডিকেল মোড়, টার্মিনাল রোডসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সমাবেশ স্থল আসতেই নগরীর মূল মূল পয়েন্টে নিজ নিজ এলাকার লোকজন জড়ো হতে থাকেন। পরে তারা এক সাথে মিছিল নিয়ে নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক দিয়ে সমাবেশস্থল আসেন।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রধান সড়কগুলোতে খণ্ড খণ্ড মিছিলের চাপ বাড়ে, আর বাড়ে স্লোগানের প্রতিধ্বনিও। ভোর ৬টার দিকে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী থেকে আসা প্রায় সহস্রাধিক লোকের একটি মিছিল নগরীর সাতমাথা এলাকা পার হয়ে রংপুর শহরে প্রবেশ করে। এছাড়াও মাঠে রাজশাহী বিভাগের বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা দলীয় লোকজনের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। তারা নিজেদের পরিচিতি জানান দিতে, নিজ এলাকা ও জেলার নামসহ ব্যানার, ফেষ্টুন নিয়ে স্লোগান দিচ্ছিলেন। যাদের বেশিরভাগই ভোর হওয়ার আগেই সমাবেশস্থলে এসে পৌঁছেছেন।
কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে দলীয় প্রতীক ধানের শীষ ছাড়াও ব্যানার, পোস্টার, ফেস্টুন নিয়ে আসা নেতা-কর্মীরা সমাবেশ স্থলে ঢুকে পড়েন। রংপুর মহানগরীর শাপলা চত্বর, গ্রান্ড হোটেল মোড়, জাহাজ কোম্পানি মোড়, পায়রা চত্বর, মেডিকেল মোড়, ডিসির মোড়, রাধাবল্লভ, কাচারি বাজার, সরকারি কলেজ রোড হয়ে দলে দলে হেঁটে হেঁটে মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থল জড়ো হন।
রাতেই মাঠ পরিদর্শন করেন মির্জা ফখরুল
বিএনপির গণসমাবেশে যোগ দিতে শুক্রবার রাত ১০টায় কালেক্টকরেট ঈদগাহ মাঠ পৌঁছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি এসময় সভামঞ্চে উঠে মাঠভর্তি নেতাকর্মীদের অভিনন্দন জানান। সমাবেশস্থলের সাজসজ্জাসহ বিভাগের আট জেলা থেকে আসা নেতাকর্মীদের উপস্থিতি দেখে তিনি আবেগআপ্লুত হয়ে পড়েন। এর আগে তিনি ঢাকা থেকে রাত পৌনে আটটার ফ্লাইটে করে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে এসে পৌছান রাত ৯টায়। পরে সেখান থেকে সড়কপথে তিনি রংপুরে ঢুকে সোজা চলে আসেন সমাবেশস্থলে।
খালি চেয়ার
সভামঞ্চে মাঝখানে সাদা কাপড় দিয়ে মোড়ানো একটি চেয়ার ফাঁকা রাখা হয়েছিল। বিএনপির নেতারা মনে করেন, আগামীতে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে এবং খালেদা জিয়া আবারও রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। সেটাকে প্রতীকী রূপ দিতে ও সম্মান জানিয়ে চেয়ারটি ফাঁকা রাখা হয়।
মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামছুজ্জামান সামু বলেন, মঞ্চে ঢেকে রাখা চেয়ারটি আমাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্য সংরক্ষিত। সেই চেয়ারে কেউ বসেনি।
আওয়ামী লীগের অবস্থান কর্মসূচি
রংপুরে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশ থেকে নগরীতে সন্ত্রাস, নৈরাজ্য সৃষ্টির অপচেষ্টাসহ সকল ধরনের নাশকতার আশংকায় অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে জেলা আওয়ামী লীগ। শনিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত নগরীর বেতপট্টিতে অবস্থিত জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে এ অবস্থান কর্মসূচি নেয় নেতৃবৃন্দ। এছাড়াও মহানগর আওয়ামী লীগ কার্যালয়েও অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায় তাদের। রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. রেজাউল করিম রাজু বলেন, আওয়ামী লীগ শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বিশ্বাসী। দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক সংগঠনের মিছিল, মিটিং ও সমাবেশ করার অধিকার রয়েছে। তবে মিছিল ও সমাবেশের নামে কোনো রাজনৈতিক দল দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি, নাশকতা ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করলে আওয়ামী লীগ প্রতিহত করার জন্য অতীতেও মাঠে ছিল। আজও আছে, ভবিষ্যতেও মাঠে থাকবে। কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করে।
সতর্ক অবস্থায় পুলিশ
রংপুরে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশ ঘিরে সতর্ক অবস্থানে ছিল পুলিশ। সমাবেশস্থল ঘিরে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশও নিয়োজিত রাখা হয়েছিল। নগরীর প্রধান প্রধান পয়েন্টেসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে এবং নগরীর প্রবেশদ্বারগুলোতে পুলিশি চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে।
পুলিশ বলছে, সমাবেশকে ঘিরে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয় এজন্য সবাই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। নগরজুড়ে নেওয়া হয়েছে চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এছাড়া রয়েছে র্যাব-পুলিশের গোয়েন্দা নজরদারি।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার নুরে আলম মিনা সাংবাদিকদের জানান, বিএনপির গণসমাবেশ ঘিরে যে কোন ধরনের ভীতিকর পরিবেশ তৈরি না হয় সেজন্য বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি সমাবেশ মাঠের চারপাশে সিসি ক্যামেরা রয়েছে।