আদম ও হাওয়া (আ.) আসারও বহু আগে থেকে বৃক্ষ তার অবারিত ছায়া বিস্তার করেছে এই পৃথিবীতে। একে রক্ষা করেছে সূর্যের প্রখর দহন থেকে। বৃক্ষ আমাদের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, চিকিৎসাসহ নানা প্রয়োজন মেটায়। আমরা যে ঘরবাড়িকে আমাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল ভাবছি, সে ঘরবাড়ির যেসব উপকরণ তার সিংহভাগই পূরণ করে থাকে এই বৃক্ষ।

বৃক্ষ আল্লাহতায়ালার অন্যতম এক নেয়ামত। বৃক্ষ মানুষকে উপহার দেয় একটি সুন্দর নির্মল সজীব সতেজ ও স্নিগ্ধ পরিবেশ। বৃক্ষ শতাব্দীর পর শতাব্দী দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে। মানবসেবায় নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে। অতি প্রাচীনকাল থেকে মানুষ যেমনিভাবে বৃক্ষের ছাল-বাকল, লতা-পাতা, শিকড়ের রস ইত্যাদি দিয়ে তাদের রোগমুক্তির চিকিৎসা করেছে, ঠিক তেমনিভাবে আজকের বিজ্ঞানের যুগেও বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় এগুলোকে শোধন করে তৈরি করা হচ্ছে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ।
এ ছাড়াও আমাদের ঘরের আসবাবপত্রের ব্যবস্থা, জ্বালানি কাঠের জোগানসহ নানা প্রয়োজনে বৃক্ষই আমাদের সাহায্য করে। কিন্তু কালের বিবর্তনে মানুষ তার পরম হিতৈষী এ বৃক্ষ নিধন করে পৃথিবীকে রূপান্তরিত করছে বৃক্ষহীন মরুতে। অথচ বৃক্ষ না থাকলে মানুষ বসবাস করতে পারবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। ভূতত্ত্ববিদরা বলেন, একটি দেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে সে দেশের মোট ভূমির ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা বাঞ্ছনীয়। তা না হলে সেখানকার আবহাওয়ার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে উত্তপ্ত হয়ে যায়। বৃষ্টিপাত কমে যায় এবং মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। অথচ আমাদের দেশের বনভূমির পরিমাণ মোট ভূমির ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ। বনভূমির ঘাটতি রয়েছে আট থেকে নয় শতাংশ। মানুষের অবহেলা ও অভিজ্ঞতার জন্য যা ছিল তাও আজ ধ্বংসের মুখোমুখি। প্রকৃতির ওপর মানুষের এহেন কর্মকান্ডে উজাড় হয়ে যাচ্ছে বন, বাড়ছে বৃক্ষনিধন।

তবে আশার কথা হলো, বৃক্ষের প্রয়োজনীয়তার প্রতি লক্ষ রেখে আমাদের দেশে প্রতি বছরই জাতীয় পর্যায়ে পালন করা হয় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। ইসলামেও এই বৃক্ষরোপণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নবীজি বলেছেন, ‘কিয়ামত এসে গেছে, এমন অবস্থায় তোমাদের কারও হাতে যদি ছোট একটি খেজুরগাছ থাকে, তাহলে সে যেন গাছটি রোপণ করে দেয়।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১২৯০২)
যদি বলা হয়, ‘বৃক্ষের অপর নাম জীবন’ তা হলে হয়তো অনেকেই অবাক হতে পারেন। কিন্তু একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলেই এর সত্যতা প্রমাণ হয়ে যায়। যে পানি ছাড়া কোনো প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে না, সেই পানির প্রধান উৎসের মধ্যে মূল্যবান উপকরণ অক্সিজেন, যা বৃক্ষ সরবরাহ করে থাকে। যদি কয়েক দিনের জন্য পৃথিবী পানিশূন্য হয়ে যায় তাহলেও অনেক প্রাণী কিছুদিনের জন্য বাঁচতে পারবে। কিন্তু অক্সিজেনের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে মানুষসহ অন্য কোনো প্রাণীই এক মুহূর্তের জন্যও বেঁচে থাকতে পারবে না।
ইসলাম বিনা প্রয়োজনে কাউকে বৃক্ষ কাটার অনুমতি দেয় না। বলাবাহুল্য, আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) নিজ হাতে বৃক্ষরোপণ করেছেন এবং এর পরিচর্যা করেছেন। পবিত্র কোরআনেও ইরশাদ হয়েছে, ‘মানুষ তার খাদ্যের প্রতি লক্ষ করুক। আমি তো অঝোর ধারায় বৃষ্টিবর্ষণ করেছি। অতঃপর মাটিকে বিদীর্ণ করেছি আর তাতে উৎপন্ন করেছি শস্যাদি, আঙুর, শাকসবজি, জলপাই, খেজুর, বহু বৃক্ষবিশিষ্ট বাগান, ফলফলাদি ও ঘাস। এসব তোমাদের ও তোমাদের পালিত পশুকুলের জীবনধারণের জন্য। (সুরা আবাছা, আয়াত : ২৪-৩২)।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলমান যদি বৃক্ষরোপণ করে কিংবা খাদ্যশস্যের বীজ বপণ করে, অতঃপর তা থেকে কোনো মানুষ, পাখি অথবা পশু কিছু অংশ খায়; তবে তার জন্য এই কাজ (বৃক্ষরোপণ) সাদাকাহ হিসেবে বিবেচিত।’ (বুখারি শরিফ, হাদিস : ২১৩৭; মুসলিম শরিফ, হাদিস : ১৫৫৩)
এ হাদিসটি আরও স্পষ্ট করে অন্য জায়গায় বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো বৃক্ষরোপণ করে, আল্লাহতায়ালা এর বিনিময়ে তাকে ওই বৃক্ষের ফলের সমপরিমাণ প্রতিদান দান করবেন।’ (মুসনাদে আহমাদ,হাদিস : ২৩৫৬৭)
অপর বর্ণনায় এসেছে, ‘বৃক্ষরোপণ একটা সদকায়ে জারিয়ার ন্যায় সৎকাজ। আজ যে একটা বৃক্ষরোপণ করলেন তার ফুল, ছায়া, শোভা, কাঠ ইত্যাদির কথা বিবেচনা করলে তার মধ্যে একটা আনন্দের ছোঁয়া পাওয়া যায়।’ সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, ইসলামেও বৃক্ষরোপণের প্রতি যথেষ্ট গুরুত্বারোপ ও উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে বেঁচে থাকতে হলে সমাজের প্রতি আমাদেরও কিছু না কিছু দায়বদ্ধতা রয়েছে। যা আমরা কেউ চাইলেই এড়িয়ে চলতে পারি না। প্রকৃতিতে ফুল ও ফসলের সম্ভার কমে যাওয়ায় আমাদের অস্তিত্ব আজ চরম হুমকির মুখে। তাই সবার উচিত, তা নিরসনে বৃক্ষরোপণে এগিয়ে আসা। সারাবছরই বৃক্ষরোপণ করা যায়। তবে বর্ষা মৌসুমে গাছ লাগানোর উপযুক্ত সময়। আর সঠিক সময় ও সঠিক স্থানে উপযুক্ত গাছ লাগালে তা বেড়ে ওঠে সুন্দরভাবে।
গাছ লাগানোর জায়গাটি বন্যামুক্ত, সূর্যের আলো পড়ে এবং বাতাস চলাচল করতে পারে এমন হলেই ভালো। দোআঁশ, বেলে দোআঁশ, এঁটেল দোআঁশ, উর্বর, সুনিষ্কাশিত ও উঁচু স্থানে গাছ লাগানো উত্তম। এখন যেহেতু গাছ লাগানোর উপযুক্ত সময় তাই আমরা চাইলেই বাড়ির আঙিনা, পতিত জমি, মসজিদ-মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালতসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সামনে ও আশপাশে ফলজ, ঔষধি, শোভাবর্ধনকারী এবং ছায়াদানকারী গাছ যেমন- আম, কাঁঠাল, তাল, খেজুর, লিচু, নারিকেল, দেবদারু, সুপারি, নিম, পাম, ঝাউ, কৃষ্ণচূড়া ইত্যাদি গাছ লাগাতে পারি।
আর এর দ্বারা আমরা দুনিয়াতে যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাব, তেমনি পরকালেও সদকায়ে জারীয়ার সওয়াব পাব। পরিশেষে স্রষ্টার কাছে এই প্রার্থনা- মাটির পরম আদরে বৃক্ষের শাখায় শাখায় ভরে উঠুক সবুজের সমারোহ।